ঢাকা ০৯:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে

বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্যের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ভারতের ওপর। বিশেষ করে পেঁয়াজ, চাল, গম, আদা, রসুন, চিনি, মসলাসহ বেশ কিছু পণ্যমূল্য কমবেশি হয় ভারতের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর। ২০২০ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা ঠেকেছিল। কারণ সেবার ভারতের পেঁয়াজ উৎপন্ন এলাকায় প্রচুর বৃষ্টির কারণে উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে।

গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এসব পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী খাদ্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখার বিষয়টি উপস্থাপন করে বলেন, চাল, গম ও পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের রফতানি বন্ধের আগে যেন ভারত সরকার জানিয়ে দেয়। তা হলে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া যাবে। বিশেষ করে তখন ভিন্ন কোনো দেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া যাবে। এতে ওইসব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয় এবং ভারতের সঙ্গে যে কটি বিষয়ে চুক্তি হয়েছে তার মধ্যে এ প্রসঙ্গ ছিল অন্যতম।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সফলতার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে এসব নিত্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন নিয়ে আলোচনা ও চুক্তি করা। এতে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো উপকৃত হবে।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসএ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরটি আমি খুবই গুরুত্ব সহকারে ফলো করেছি। সফরটি রাজনৈতিকভাবে যতটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই ছিল বাণিজ্যিকভাবে। নেপাল ও ভুটানে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশকে ভারত বিনামূল্যে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশ সদ্য উদ্বোধন হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুটের মাধ্যমে ভুটানের সঙ্গে রেল যোগাযোগের অনুরোধ করেছে। ভারত সে অনুরোধ কার্যকারিতা ও সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে। দুই নেতা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) মোটরযান চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছেন। এসব উদ্যোগের ফলে শুধু ভারতের সঙ্গেই বাণিজ্য বাড়বে তা নয়, দক্ষিণ এশিয়া তথা এ অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। আমি মনে করি এটি খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গম, ভুট্টাসহ অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। এসব পণ্য ভারতেও প্রচুর উৎপাদন হয়। তা ছাড়া ভারত থেকে আমাদের দেশে প্রচুর পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। মূলত বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার ভারতের পেঁয়াজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এবারের সফরে এসব পণ্য নিয়ে আলোচনা হওয়ায় আশা করব আগামীতে এসব পণ্য আরও সহজে আমরা ভারত থেকে আনতে পারব। এর ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, এ অঞ্চলের অন্য দেশও উপকৃত হবে। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও মজবুত হলো।’

অন্যদিকে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিত্যপণ্য নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তাতে আমি খুবই আশাবাদী যে, এসব পণ্য আগের চেয়ে আরও সহজে বাংলাদেশ আমদানি করতে পারবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর বিষয়টি যেন ঝিমিয়ে না পড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তির বাস্তবায়ন করতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ যেসব খাদ্যসামগ্রী আমদানি করে তার মধ্যে শীর্ষ ১০টি পণ্যের মধ্যে রয়েছে- অপরিশোধিত চিনি, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, আদা, মরিচ, গম, চাল, মসুর ডাল ও পেঁয়াজ। এ ছাড়া রসুন, চা, তেলবীজ ও হলুদ রয়েছে শীর্ষ খাদ্যসামগ্রী আমদানির মধ্যে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ভুট্টা, শুকনো সবজি, আপেল ও সিট্রাসজাতীয় ফল এবং জাফরান, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা আমদানি করা হয়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে চিনি, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুরসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি করা হয়। এর বাইরে চাল, গম ও ভুট্টার মতো খাদ্যশস্য আমদানি হয় জিটুজি মানে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের চুক্তির মাধ্যমে ও ব্যক্তি উদ্যোগে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি হয়। দেশটি থেকে যেসব খাদ্যপণ্য আমদানি হয় দেশে তার মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, সূর্যমুখী ও সয়াবিন তেলসহ ভোজ্য তেল, চিনি, মধু, কোমলপানীয়, চিপস, বিস্কুট, চকলেট ও ক্যান্ডি জাতীয় খাবার। বাংলাদেশে বারিক পেঁয়াজের চাহিদার ৪০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার ৯৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে আরও জানা যায়, আমদানি পণ্যের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আমদানি হয় চীন থেকে, মোট আমদানির ২৬ শতাংশেরও বেশি। তালিকায় এরপরই রয়েছে ভারত, যে দেশটি থেকে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আমদানি হয়। এরপর ক্রমে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে।

অন্যদিকে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা হয় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত সফরে চুক্তির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ থেকে রফতানি বছরে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে খাদ্যপণ্য নিয়ে যে আলোচনাটি হয় : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে ভারত থেকে দেশে ফেরেন গত বৃহস্পতিবার। তিন বছর পর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সাধারণের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। এবারের সফরে বাংলাদেশ কী পেল আর কী দিল- এই সমীকরণ মিলিয়েছেন অনেকেই। এবারের সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। চাল, গম, চিনিসহ বেশ কিছু পণ্যের সাপ্লাই চেইন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ভারত থেকে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানি করে। এসব পণ্যের অনুমানযোগ্য সরবরাহের জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করেন তিনি। এ সময় তিনি এ-ও বলেন, এসব পণ্যের রফতানি বন্ধের আগে যেন বাংলাদেশকে জানিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- ভারতের বিদ্যমান সরবরাহের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অনুরোধগুলো অনুকূলভাবে বিবেচনা করা হবে এবং এই বিষয়ে সব ধরনের প্রয়াস চালানো হবে।

Tag :
জনপ্রিয়

মাদারদিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে

প্রকাশের সময় : ০৯:১৪:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২

বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্যের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ভারতের ওপর। বিশেষ করে পেঁয়াজ, চাল, গম, আদা, রসুন, চিনি, মসলাসহ বেশ কিছু পণ্যমূল্য কমবেশি হয় ভারতের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর। ২০২০ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা ঠেকেছিল। কারণ সেবার ভারতের পেঁয়াজ উৎপন্ন এলাকায় প্রচুর বৃষ্টির কারণে উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে।

গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এসব পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী খাদ্যপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখার বিষয়টি উপস্থাপন করে বলেন, চাল, গম ও পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের রফতানি বন্ধের আগে যেন ভারত সরকার জানিয়ে দেয়। তা হলে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া যাবে। বিশেষ করে তখন ভিন্ন কোনো দেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া যাবে। এতে ওইসব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয় এবং ভারতের সঙ্গে যে কটি বিষয়ে চুক্তি হয়েছে তার মধ্যে এ প্রসঙ্গ ছিল অন্যতম।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সফলতার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে এসব নিত্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন নিয়ে আলোচনা ও চুক্তি করা। এতে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো উপকৃত হবে।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসএ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরটি আমি খুবই গুরুত্ব সহকারে ফলো করেছি। সফরটি রাজনৈতিকভাবে যতটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই ছিল বাণিজ্যিকভাবে। নেপাল ও ভুটানে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশকে ভারত বিনামূল্যে ট্রানজিট দিয়েছে। বাংলাদেশ সদ্য উদ্বোধন হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুটের মাধ্যমে ভুটানের সঙ্গে রেল যোগাযোগের অনুরোধ করেছে। ভারত সে অনুরোধ কার্যকারিতা ও সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে। দুই নেতা বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) মোটরযান চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছেন। এসব উদ্যোগের ফলে শুধু ভারতের সঙ্গেই বাণিজ্য বাড়বে তা নয়, দক্ষিণ এশিয়া তথা এ অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। আমি মনে করি এটি খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গম, ভুট্টাসহ অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। এসব পণ্য ভারতেও প্রচুর উৎপাদন হয়। তা ছাড়া ভারত থেকে আমাদের দেশে প্রচুর পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। মূলত বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার ভারতের পেঁয়াজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এবারের সফরে এসব পণ্য নিয়ে আলোচনা হওয়ায় আশা করব আগামীতে এসব পণ্য আরও সহজে আমরা ভারত থেকে আনতে পারব। এর ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, এ অঞ্চলের অন্য দেশও উপকৃত হবে। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও মজবুত হলো।’

অন্যদিকে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিত্যপণ্য নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তাতে আমি খুবই আশাবাদী যে, এসব পণ্য আগের চেয়ে আরও সহজে বাংলাদেশ আমদানি করতে পারবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর বিষয়টি যেন ঝিমিয়ে না পড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তির বাস্তবায়ন করতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ যেসব খাদ্যসামগ্রী আমদানি করে তার মধ্যে শীর্ষ ১০টি পণ্যের মধ্যে রয়েছে- অপরিশোধিত চিনি, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, আদা, মরিচ, গম, চাল, মসুর ডাল ও পেঁয়াজ। এ ছাড়া রসুন, চা, তেলবীজ ও হলুদ রয়েছে শীর্ষ খাদ্যসামগ্রী আমদানির মধ্যে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ভুট্টা, শুকনো সবজি, আপেল ও সিট্রাসজাতীয় ফল এবং জাফরান, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা আমদানি করা হয়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মধ্যে চিনি, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুরসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি করা হয়। এর বাইরে চাল, গম ও ভুট্টার মতো খাদ্যশস্য আমদানি হয় জিটুজি মানে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের চুক্তির মাধ্যমে ও ব্যক্তি উদ্যোগে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি হয়। দেশটি থেকে যেসব খাদ্যপণ্য আমদানি হয় দেশে তার মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, সূর্যমুখী ও সয়াবিন তেলসহ ভোজ্য তেল, চিনি, মধু, কোমলপানীয়, চিপস, বিস্কুট, চকলেট ও ক্যান্ডি জাতীয় খাবার। বাংলাদেশে বারিক পেঁয়াজের চাহিদার ৪০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার ৯৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে আরও জানা যায়, আমদানি পণ্যের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আমদানি হয় চীন থেকে, মোট আমদানির ২৬ শতাংশেরও বেশি। তালিকায় এরপরই রয়েছে ভারত, যে দেশটি থেকে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আমদানি হয়। এরপর ক্রমে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে।

অন্যদিকে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা হয় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত সফরে চুক্তির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ থেকে রফতানি বছরে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে খাদ্যপণ্য নিয়ে যে আলোচনাটি হয় : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে ভারত থেকে দেশে ফেরেন গত বৃহস্পতিবার। তিন বছর পর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সাধারণের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। এবারের সফরে বাংলাদেশ কী পেল আর কী দিল- এই সমীকরণ মিলিয়েছেন অনেকেই। এবারের সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। চাল, গম, চিনিসহ বেশ কিছু পণ্যের সাপ্লাই চেইন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ভারত থেকে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানি করে। এসব পণ্যের অনুমানযোগ্য সরবরাহের জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করেন তিনি। এ সময় তিনি এ-ও বলেন, এসব পণ্যের রফতানি বন্ধের আগে যেন বাংলাদেশকে জানিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- ভারতের বিদ্যমান সরবরাহের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অনুরোধগুলো অনুকূলভাবে বিবেচনা করা হবে এবং এই বিষয়ে সব ধরনের প্রয়াস চালানো হবে।