ঢাকা ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

এ যেন এক শাপলার রাজ্য

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার শত বছরের পুরনো চাঁচুড়ী বিল। বছরের অধিকাংশ সময় বিলটি জলমগ্ন থাকে। বিলের যত ভিতরে যাওয়া যায় ততই চোখে পড়ে শাপলার আধিক্য। মনে হয় এ যেন শাপলার রাজ্য। গাঢ় সবুজের বুকে এক ‘লাল স্বর্গ’। বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন এ বিলে লাল, সাদা ও বেগুনি রঙের তিন ধরনের শাপলা জন্মালেও সাদা ও লাল শাপলার আধিক্য বেশি থাকে। মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। চাঁচুড়ী বিলের ফুটন্ত শাপলা দেখতে যেতে হয় সকালে কিংবা বিকালে। ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই সূর্যের আলোর ঝলকানিতে শাপলা ফুলের হাসি খুবই মনোমুগ্ধকর। এলাকাবাসীর কাছে এটি বর্ষাকালে ‘শাপলা বিল’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়। এক সময় বর্ষাকালে পুরোপুরি ডুবে যেত চাঁচুড়ী বিল। এ বিলের বড় অংশ ‘নালের বিলে’ সারা বছরই পানি থাকত। এখন বিলে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে অসংখ্য মাছের ঘের গড়ে উঠেছে। তবে শাপলা ফোটায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। এখানে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফোটে। এ বিলের মধ্যে এঁকে-বেঁকে বয়ে গেছে ‘লাইনের খাল’, ‘নালের খাল’, ‘ছোট খাল’, ‘বড় খাল’সহ নাম না জানা অনেক খাল। এখানেও রং-বেরঙের শাপলা ফুল ফুটে। যা এই বিলের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত জুন ও জুলাই মাসে এই বিলে শাপলা ফোটে। তখন নৌকা নিয়ে এই বিলে যাওয়া আরেক প্রাপ্তি। এ বিলে শুধু শাপলাই ফোটে না, শীত মৌসুমে পানি কমে গেলে এখানে ধান চাষ করা হয়। একই সঙ্গে মাছ, ধান ও শাপলার সহাবস্থান রয়েছে এখানে। সূর্যের সোনালি আভা শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে বাড়িয়ে দেয় এর সৌন্দর্য। আগাছা আর লতা-পাতায় ভরা বিলে সহস্র লাল ও সাদা শাপলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়।

নড়াইল সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী ইউনিয়নের উত্তরাংশে অবস্থিত পার্শ্ববর্তী লোহাগড়া ও সদর উপজেলার একাংশের কয়েকটি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এ বিল। এখন স্থানীয়দের কাছে শাপলার বিল নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। চাঁচুড়ী বিলের মোট আয়তন সম্পর্কে সঠিক তথ্য বলতে পারেননি কেউ। তেমনি এ বিলে ঠিক কত বছর আগে থেকে শাপলা জন্মায় সে তথ্যও সঠিকভাবে দিতে পারেননি কেউ। স্থানীয়রা জানান, বাজারে সাদা শাপলার কদর বেশি। সাদা শাপলার তরকারি খেতে বেশি সুস্বাদু। লাল শাপলার কদর থাকলেও এটি রান্না করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। এ ছাড়া দীর্ঘকাল থেকেই শাপলার ফল (ঢ্যাপ) দিয়ে সুস্বাদু খই ভাজা যায়। যা গ্রামগঞ্জে ঢ্যাপের খই নামে পরিচিত। মাটির নিচের মূল অংশকে (রাউজোম) স্থানীয় ভাষায় শালুক বলে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিলের পানি কমে যাওয়ার পর শালুক তোলা হয়। যা খেতেও বেশ সুস্বাদু। আমাশয়ের জন্য এটি খুবই উপকারী।
বিল সংলগ্ন গ্রামের একাধিক কৃষক বলেন, বছরের ছয় মাস এই বিলের শাপলার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে এলাকার শত শত পরিবার। এদের কেউ শাপলা তুলে, কেউবা বিল থেকে মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করেন।

চাঁচুড়ী বিল সংলগ্ন ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের বাসিন্দা ইকরাম শেখ ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে প্রতিদিনই বিলের পানিতে মাছ শিকার ও শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। এ বিলে খাদ্যের বেশ জোগান থাকায় দেশি মাছও ধরা পড়ে প্রচুর। কৃষ্ণপুর গ্রামের নিরাঞ্জন বিশ্বাস জানান, তিনি মূলত মাছ কেনাবেচার কাজ করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে এ বিলের শাপলা তুলে ও মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দীপক কুমার রায় জানান, ‘সাধারণত শাপলা তিন প্রকারের হয়ে থাকে- সাদা, বেগুনি (হুন্দি শাপলা) ও লাল। শাপলা খুব পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। শাপলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম।’

Tag :
জনপ্রিয়

মাদারদিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

এ যেন এক শাপলার রাজ্য

প্রকাশের সময় : ১০:০২:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার শত বছরের পুরনো চাঁচুড়ী বিল। বছরের অধিকাংশ সময় বিলটি জলমগ্ন থাকে। বিলের যত ভিতরে যাওয়া যায় ততই চোখে পড়ে শাপলার আধিক্য। মনে হয় এ যেন শাপলার রাজ্য। গাঢ় সবুজের বুকে এক ‘লাল স্বর্গ’। বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন এ বিলে লাল, সাদা ও বেগুনি রঙের তিন ধরনের শাপলা জন্মালেও সাদা ও লাল শাপলার আধিক্য বেশি থাকে। মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। চাঁচুড়ী বিলের ফুটন্ত শাপলা দেখতে যেতে হয় সকালে কিংবা বিকালে। ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই সূর্যের আলোর ঝলকানিতে শাপলা ফুলের হাসি খুবই মনোমুগ্ধকর। এলাকাবাসীর কাছে এটি বর্ষাকালে ‘শাপলা বিল’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়। এক সময় বর্ষাকালে পুরোপুরি ডুবে যেত চাঁচুড়ী বিল। এ বিলের বড় অংশ ‘নালের বিলে’ সারা বছরই পানি থাকত। এখন বিলে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে অসংখ্য মাছের ঘের গড়ে উঠেছে। তবে শাপলা ফোটায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। এখানে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফোটে। এ বিলের মধ্যে এঁকে-বেঁকে বয়ে গেছে ‘লাইনের খাল’, ‘নালের খাল’, ‘ছোট খাল’, ‘বড় খাল’সহ নাম না জানা অনেক খাল। এখানেও রং-বেরঙের শাপলা ফুল ফুটে। যা এই বিলের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত জুন ও জুলাই মাসে এই বিলে শাপলা ফোটে। তখন নৌকা নিয়ে এই বিলে যাওয়া আরেক প্রাপ্তি। এ বিলে শুধু শাপলাই ফোটে না, শীত মৌসুমে পানি কমে গেলে এখানে ধান চাষ করা হয়। একই সঙ্গে মাছ, ধান ও শাপলার সহাবস্থান রয়েছে এখানে। সূর্যের সোনালি আভা শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে বাড়িয়ে দেয় এর সৌন্দর্য। আগাছা আর লতা-পাতায় ভরা বিলে সহস্র লাল ও সাদা শাপলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়।

নড়াইল সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী ইউনিয়নের উত্তরাংশে অবস্থিত পার্শ্ববর্তী লোহাগড়া ও সদর উপজেলার একাংশের কয়েকটি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এ বিল। এখন স্থানীয়দের কাছে শাপলার বিল নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। চাঁচুড়ী বিলের মোট আয়তন সম্পর্কে সঠিক তথ্য বলতে পারেননি কেউ। তেমনি এ বিলে ঠিক কত বছর আগে থেকে শাপলা জন্মায় সে তথ্যও সঠিকভাবে দিতে পারেননি কেউ। স্থানীয়রা জানান, বাজারে সাদা শাপলার কদর বেশি। সাদা শাপলার তরকারি খেতে বেশি সুস্বাদু। লাল শাপলার কদর থাকলেও এটি রান্না করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। এ ছাড়া দীর্ঘকাল থেকেই শাপলার ফল (ঢ্যাপ) দিয়ে সুস্বাদু খই ভাজা যায়। যা গ্রামগঞ্জে ঢ্যাপের খই নামে পরিচিত। মাটির নিচের মূল অংশকে (রাউজোম) স্থানীয় ভাষায় শালুক বলে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিলের পানি কমে যাওয়ার পর শালুক তোলা হয়। যা খেতেও বেশ সুস্বাদু। আমাশয়ের জন্য এটি খুবই উপকারী।
বিল সংলগ্ন গ্রামের একাধিক কৃষক বলেন, বছরের ছয় মাস এই বিলের শাপলার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে এলাকার শত শত পরিবার। এদের কেউ শাপলা তুলে, কেউবা বিল থেকে মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করেন।

চাঁচুড়ী বিল সংলগ্ন ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের বাসিন্দা ইকরাম শেখ ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে প্রতিদিনই বিলের পানিতে মাছ শিকার ও শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। এ বিলে খাদ্যের বেশ জোগান থাকায় দেশি মাছও ধরা পড়ে প্রচুর। কৃষ্ণপুর গ্রামের নিরাঞ্জন বিশ্বাস জানান, তিনি মূলত মাছ কেনাবেচার কাজ করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে এ বিলের শাপলা তুলে ও মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দীপক কুমার রায় জানান, ‘সাধারণত শাপলা তিন প্রকারের হয়ে থাকে- সাদা, বেগুনি (হুন্দি শাপলা) ও লাল। শাপলা খুব পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। শাপলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম।’