ঢাকা ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
ঢাকার বস্তি ও উর্দুুভাষী অবাঙালি ক্যাম্পের চিত্র

উড়ছে টাকা, চলছে ফুর্তি

ঢাকার বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলো যেন টাকার খনি। প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি কাঁচা টাকা উড়ছে। এসব টাকা চলে যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পকেটে। প্রতিটি বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলোতে রয়েছে হাজার হাজার অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ। ফলে সরকারকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাসিন্দাদের প্রতি মাসেই এসবের বিনিময়ে টাকা দিতে হচ্ছে। তবে সরকারের কাছে নয়- স্থানীয় প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন এসব টাকা। তাই এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রায়ই হত্যাকান্ড ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরও বস্তির অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলেই ঘটছে সংঘর্ষ। সবশেষ কড়াইল বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার সূত্র ধরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা আলামিনকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বস্তির আধিপত্য বিস্তারের জের ধরেই গত ১৭ আগস্ট আলামিন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। আহত হন ১০ জন। আর এসব ঘটে বস্তির কাঁচা টাকার সূত্র ধরে। বস্তিটিতে থাকা প্রায় ৪০ হাজার ঘর থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। টাকার একটি বড় অংশ যাচ্ছে উচ্চ পর্যায়েও।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, বস্তিটি গড়ে উঠেছে টিঅ্যান্ডটি, রাজউক ও পিডবিস্নউডির সরকারি জায়গার ওপর। বস্তিতে ঘরের সংখ্যা কম করে হলেও ৪০ হাজার। গড়ে প্রতি ঘর থেকে ভাড়া হিসেবে বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা আদায় করছেন গড়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা করে। সবমিলিয়ে শুধু ঘর ভাড়া থেকেই বস্তিটি থেকে আদায় হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ, দোকানপাট, গ্যাসের লাইন, মাদক বিক্রি ও নানা অসামাজিক কাজ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আসে। এসব টাকার সিংহভাগই পায় বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা। বস্তিতে যাদের আধিপত্য থাকবে তাদের কাছেই টাকার ভাগ যাবে।

ডিবি প্রধান জানান, স্বাভাবিক কারণেই বস্তির আধিপত্য নিতে মরিয়া একাধিক গ্রম্নপ। যেটি প্রকাশ্যে আসে ডেসকো কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বস্তিতে থাকা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে যাওয়ার পর। সংযোগ কাটতে গেলে বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনদের প্রকাশ্যে মারধর করে। তারই ধারাবাহিকতায় আলামিন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতা ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কাদের খান ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মফিজুর রহমানের সঙ্গে। ২০১২ সালে কড়াইল বস্তির পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য সেবার টাকার ভাগাভাগির সূত্র ধরে ক্যাশিয়ার বশির,

২০১৪ সালে একই কাজে দুলাল সরদার, ২০১৮ সালে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কথা বলায় সরকারি তিতুমীর কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র রাকিব হোসাইন, একই বছর একই কারণে রাশেদ কাজী হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় বর্তমানে বস্তির সংখ্যা ছোটবড় একশটি। যার মধ্যে বনানীর কড়াইল, মিরপুরের শিয়ালবাড়ী, মিরপুরের চলন্তিকা বস্তি, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি, ভাষানটেক বস্তি, ধলপুর বস্তি, কমলাপুর রেলওয়ে বস্তি সবচেয়ে বড়। এই বস্তিগুলোর প্রতিটিতে গড়ে ৩৫ হাজারের বেশি ঘর আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি বস্তি নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, মাস্তান, জনপ্রতিনিধি ও মাদক ব্যবসায়ী। সব বস্তিই সরকারি জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। বস্তির ঘর নিয়ন্ত্রণ করা হয় দুই উপায়ে। একটি হচ্ছে, প্রথমে সেখানকার প্রভাবশালী একাধিক ব্যক্তি পৃথক পৃথকভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে জমিতে ঘর তুলে। সেই ঘর আকার ভেদে ভাড়া দেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রতিটি ১০ ফুট প্রস্থ ও ১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের বস্তি ঘরের ভাড়া কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিস বা ইন্টারনেট কানেকশন। এই চার সেবা নিয়ন্ত্রিত হয় একটি বিশেষ প্যাকেজে। প্রতি ঘরে একটি সিলিং ফ্যান, একটি লাইট, একটি গ্যাসের চুলা, একটি টেলিভিশন বাবদ প্যাকেজ মূল্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আর ডিস বা ইন্টারনেট লাইন ও ডাবল চুলা এবং একটি ফ্রিজে বিদ্যুৎ সংযোগের প্যাকেজ মূল্য চার হাজার টাকা। অধিকাংশ বস্তি ঘরে ফ্রিজ বা টেলিভিশন না থাকলেও প্যাকেজ মূল্য কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। না দিলে বস্তিতে থাকতে দেওয়া হয় না। অনেক সময় ভাড়া দিতে দেরি হলে ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে যায় ভাড়া আদায়কারীরা। এসব সংযোগের কোনো মিটার নেই। অর্থাৎ সবই অবৈধ সংযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামা মাত্রই বস্তির ভেতরে মাদকের আসর বসে। সেইসব আসরে চলে মাদক সেবন- ইয়াবা, ফেনসিডিল, ড্যান্ডি, হেরোইন, বাংলা বা চোলাই মদ ও গাঁজা। মাদক বিক্রেতাদের আবার সিন্ডিকেট আছে। বস্তির ভেতরে শুধু তারাই মাদক বিক্রি করতে পারবে। অন্য কেউ বিক্রি করতে পারবে না। এমনকি কিনতেও পারবে না। অসামাজিক কর্মকান্ড চালানোর জন্য বস্তির ভেতরে সুন্দর রুমও আছে। ভেতরে এসি, ফ্রিজ, সোফা থেকে শুরু করে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা আছে। পরিপাটি এসব রুমে মাদক সেবনের পাশাপাশি চলে অসামাজিক কর্মকান্ড।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে ঢাকায় থাকা উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলোতেও। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব ক্যাম্পের বাসিন্দাদের বিনামূল্যে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কথা। যেটি দিতে সরকার বাধ্য। কিন্তু বর্তমানে ক্যাম্পগুলোর প্রায় শতভাগ বাসিন্দাই বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ তারা পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের কোনো বিল দিতে রাজি না।

আজ পর্যন্ত সরকার তাদের কাছ থেকে কোনো পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আদায় করতে পারেনি। প্রতি মাসে শুধু মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডে থাকা উর্দুভাষী অবাঙালিদের দুটি ক্যাম্পেই সরকারকে ১০ কোটি টাকা বিদ্যুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখানে বিদ্যুতের কোনো মিটার নেই। পাশাপাশি ঘর থেকে অবৈধভাবে অন্য জায়গায় বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে গেলেই রাস্তায় নেমে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তারা।

এসব অপকর্মের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এছাড়া ক্যাম্পগুলো মাদকের আখড়া। ক্যাম্পগুলো এতটাই ঘনবসতিপূর্ণ যে, সেখানে মাদকবিরোধী অভিযান চালানো রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোপূর্বে বহুবার মাদকবিরোধী অভিযানে মোহাম্মদপুরের উর্দুভাষী অবাঙালিদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্প টিকিয়ে রাখার নেপথ্য কারিগরদের অন্যতম বিভিন্ন এনজিও। বহু এনজিও বস্তি ও ক্যাম্প দেখিয়ে বিদেশ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা এনে পকেটে পুরছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্যাম্পগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আর স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে রয়েছে বস্তিগুলো। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ও অধীন ৩০টি সংস্থা, সুশীল সমাজ, হাজারখানেক এনজিও এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা পুরো কর্মকান্ডে জড়িত।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর তোফায়েল আহমেদ বলছেন, মানুষ যাতে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কিছু উপার্জন করতে পারে এজন্য সরকার গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে কাজ করছে। যাতে শহরের ওপর মানুষের চাপ কমে। পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাজটি করা সরকারের জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়ায় সবক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে।

তিনি বলেন, বস্তিতে বসবাসকারীদের অধিকাংশই নদীভাঙন এলাকার মানুষ। নদীভাঙনে বাড়িঘর জমি বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে শহরে ছুটেন। নিরূপায় হয়ে আশ্রয় নেন বস্তিতে। বস্তিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার আলো আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেরাই অন্যত্র সরে গিয়ে উন্নত জীবনযাপন করতে পারেন।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি জরুরি বস্তিবাসীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা। যাতে বস্তিবাসীরা এক সময় বস্তির জীবন ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ভালো জীবনযাপন করতে পারেন।

প্রসঙ্গত, পুনর্বাসন ছাড়া বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ না করতে বিশিষ্ট আইনজীবী ডক্টর কামাল হোসেন ও তার মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বস্তিবাসীদের পক্ষে বহু রিট আবেদন করেছেন। উচ্চ আদালত মানবিক কারণে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন ব্যতীত উচ্ছেদ না করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। যে কারণে সরকার চাইলেই বস্তি উচ্ছেদ করতে পারছে না।

Tag :
জনপ্রিয়

মাদারদিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

ঢাকার বস্তি ও উর্দুুভাষী অবাঙালি ক্যাম্পের চিত্র

উড়ছে টাকা, চলছে ফুর্তি

প্রকাশের সময় : ০৯:২৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঢাকার বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলো যেন টাকার খনি। প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি কাঁচা টাকা উড়ছে। এসব টাকা চলে যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পকেটে। প্রতিটি বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলোতে রয়েছে হাজার হাজার অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ। ফলে সরকারকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাসিন্দাদের প্রতি মাসেই এসবের বিনিময়ে টাকা দিতে হচ্ছে। তবে সরকারের কাছে নয়- স্থানীয় প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন এসব টাকা। তাই এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রায়ই হত্যাকান্ড ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরও বস্তির অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলেই ঘটছে সংঘর্ষ। সবশেষ কড়াইল বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার সূত্র ধরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা আলামিনকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বস্তির আধিপত্য বিস্তারের জের ধরেই গত ১৭ আগস্ট আলামিন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। আহত হন ১০ জন। আর এসব ঘটে বস্তির কাঁচা টাকার সূত্র ধরে। বস্তিটিতে থাকা প্রায় ৪০ হাজার ঘর থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। টাকার একটি বড় অংশ যাচ্ছে উচ্চ পর্যায়েও।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, বস্তিটি গড়ে উঠেছে টিঅ্যান্ডটি, রাজউক ও পিডবিস্নউডির সরকারি জায়গার ওপর। বস্তিতে ঘরের সংখ্যা কম করে হলেও ৪০ হাজার। গড়ে প্রতি ঘর থেকে ভাড়া হিসেবে বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা আদায় করছেন গড়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা করে। সবমিলিয়ে শুধু ঘর ভাড়া থেকেই বস্তিটি থেকে আদায় হচ্ছে ৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ, দোকানপাট, গ্যাসের লাইন, মাদক বিক্রি ও নানা অসামাজিক কাজ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আসে। এসব টাকার সিংহভাগই পায় বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা। বস্তিতে যাদের আধিপত্য থাকবে তাদের কাছেই টাকার ভাগ যাবে।

ডিবি প্রধান জানান, স্বাভাবিক কারণেই বস্তির আধিপত্য নিতে মরিয়া একাধিক গ্রম্নপ। যেটি প্রকাশ্যে আসে ডেসকো কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বস্তিতে থাকা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে যাওয়ার পর। সংযোগ কাটতে গেলে বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীরা বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনদের প্রকাশ্যে মারধর করে। তারই ধারাবাহিকতায় আলামিন হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতা ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কাদের খান ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মফিজুর রহমানের সঙ্গে। ২০১২ সালে কড়াইল বস্তির পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য সেবার টাকার ভাগাভাগির সূত্র ধরে ক্যাশিয়ার বশির,

২০১৪ সালে একই কাজে দুলাল সরদার, ২০১৮ সালে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কথা বলায় সরকারি তিতুমীর কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র রাকিব হোসাইন, একই বছর একই কারণে রাশেদ কাজী হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় বর্তমানে বস্তির সংখ্যা ছোটবড় একশটি। যার মধ্যে বনানীর কড়াইল, মিরপুরের শিয়ালবাড়ী, মিরপুরের চলন্তিকা বস্তি, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি, ভাষানটেক বস্তি, ধলপুর বস্তি, কমলাপুর রেলওয়ে বস্তি সবচেয়ে বড়। এই বস্তিগুলোর প্রতিটিতে গড়ে ৩৫ হাজারের বেশি ঘর আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি বস্তি নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, মাস্তান, জনপ্রতিনিধি ও মাদক ব্যবসায়ী। সব বস্তিই সরকারি জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে। বস্তির ঘর নিয়ন্ত্রণ করা হয় দুই উপায়ে। একটি হচ্ছে, প্রথমে সেখানকার প্রভাবশালী একাধিক ব্যক্তি পৃথক পৃথকভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে জমিতে ঘর তুলে। সেই ঘর আকার ভেদে ভাড়া দেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রতিটি ১০ ফুট প্রস্থ ও ১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের বস্তি ঘরের ভাড়া কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিস বা ইন্টারনেট কানেকশন। এই চার সেবা নিয়ন্ত্রিত হয় একটি বিশেষ প্যাকেজে। প্রতি ঘরে একটি সিলিং ফ্যান, একটি লাইট, একটি গ্যাসের চুলা, একটি টেলিভিশন বাবদ প্যাকেজ মূল্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আর ডিস বা ইন্টারনেট লাইন ও ডাবল চুলা এবং একটি ফ্রিজে বিদ্যুৎ সংযোগের প্যাকেজ মূল্য চার হাজার টাকা। অধিকাংশ বস্তি ঘরে ফ্রিজ বা টেলিভিশন না থাকলেও প্যাকেজ মূল্য কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। না দিলে বস্তিতে থাকতে দেওয়া হয় না। অনেক সময় ভাড়া দিতে দেরি হলে ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে যায় ভাড়া আদায়কারীরা। এসব সংযোগের কোনো মিটার নেই। অর্থাৎ সবই অবৈধ সংযোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামা মাত্রই বস্তির ভেতরে মাদকের আসর বসে। সেইসব আসরে চলে মাদক সেবন- ইয়াবা, ফেনসিডিল, ড্যান্ডি, হেরোইন, বাংলা বা চোলাই মদ ও গাঁজা। মাদক বিক্রেতাদের আবার সিন্ডিকেট আছে। বস্তির ভেতরে শুধু তারাই মাদক বিক্রি করতে পারবে। অন্য কেউ বিক্রি করতে পারবে না। এমনকি কিনতেও পারবে না। অসামাজিক কর্মকান্ড চালানোর জন্য বস্তির ভেতরে সুন্দর রুমও আছে। ভেতরে এসি, ফ্রিজ, সোফা থেকে শুরু করে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা আছে। পরিপাটি এসব রুমে মাদক সেবনের পাশাপাশি চলে অসামাজিক কর্মকান্ড।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে ঢাকায় থাকা উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্পগুলোতেও। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব ক্যাম্পের বাসিন্দাদের বিনামূল্যে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কথা। যেটি দিতে সরকার বাধ্য। কিন্তু বর্তমানে ক্যাম্পগুলোর প্রায় শতভাগ বাসিন্দাই বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ তারা পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের কোনো বিল দিতে রাজি না।

আজ পর্যন্ত সরকার তাদের কাছ থেকে কোনো পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আদায় করতে পারেনি। প্রতি মাসে শুধু মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডে থাকা উর্দুভাষী অবাঙালিদের দুটি ক্যাম্পেই সরকারকে ১০ কোটি টাকা বিদ্যুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখানে বিদ্যুতের কোনো মিটার নেই। পাশাপাশি ঘর থেকে অবৈধভাবে অন্য জায়গায় বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে গেলেই রাস্তায় নেমে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তারা।

এসব অপকর্মের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এছাড়া ক্যাম্পগুলো মাদকের আখড়া। ক্যাম্পগুলো এতটাই ঘনবসতিপূর্ণ যে, সেখানে মাদকবিরোধী অভিযান চালানো রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোপূর্বে বহুবার মাদকবিরোধী অভিযানে মোহাম্মদপুরের উর্দুভাষী অবাঙালিদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বস্তি ও উর্দুভাষী অবাঙালিদের ক্যাম্প টিকিয়ে রাখার নেপথ্য কারিগরদের অন্যতম বিভিন্ন এনজিও। বহু এনজিও বস্তি ও ক্যাম্প দেখিয়ে বিদেশ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা এনে পকেটে পুরছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্যাম্পগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আর স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে রয়েছে বস্তিগুলো। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ও অধীন ৩০টি সংস্থা, সুশীল সমাজ, হাজারখানেক এনজিও এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা পুরো কর্মকান্ডে জড়িত।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর তোফায়েল আহমেদ বলছেন, মানুষ যাতে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কিছু উপার্জন করতে পারে এজন্য সরকার গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে কাজ করছে। যাতে শহরের ওপর মানুষের চাপ কমে। পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাজটি করা সরকারের জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়ায় সবক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে।

তিনি বলেন, বস্তিতে বসবাসকারীদের অধিকাংশই নদীভাঙন এলাকার মানুষ। নদীভাঙনে বাড়িঘর জমি বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে শহরে ছুটেন। নিরূপায় হয়ে আশ্রয় নেন বস্তিতে। বস্তিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার আলো আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেরাই অন্যত্র সরে গিয়ে উন্নত জীবনযাপন করতে পারেন।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি জরুরি বস্তিবাসীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা। যাতে বস্তিবাসীরা এক সময় বস্তির জীবন ছেড়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ভালো জীবনযাপন করতে পারেন।

প্রসঙ্গত, পুনর্বাসন ছাড়া বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ না করতে বিশিষ্ট আইনজীবী ডক্টর কামাল হোসেন ও তার মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বস্তিবাসীদের পক্ষে বহু রিট আবেদন করেছেন। উচ্চ আদালত মানবিক কারণে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন ব্যতীত উচ্ছেদ না করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। যে কারণে সরকার চাইলেই বস্তি উচ্ছেদ করতে পারছে না।