ঢাকা ০১:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি দক্ষিণে মশা বেশি

টানা তিন দিন থেমে থেমে জ্বর। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। এমবিএর শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন খান ভাবলেন সাধারণ জ্বর। ওষুধের দোকান থেকে জ্বরের ওষুধ কিনে খেলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন গোপীবাগের এই বাসিন্দা।

কিন্তু জ্বর আর সারে না। অথচ সামনে পরীক্ষা। এরপর চিকিৎসক দেখিয়ে তাঁর পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করালেন। শনাক্ত হলো ডেঙ্গু।

এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রাকিব বলেন, চার দিন রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর এখন অনেকটা সুস্থ। এর মধ্যে এলাকার পরিচিত বেশ কয়েকজনকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে দেখেছেন। তাঁর পরিচিত দুজন এখনো ভর্তি একই হাসপাতালে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আরেকটি এলাকা রেলওয়ে ব্যারাক। সেখানকার শিশু রবিউল সানির (১০) জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া ও বমি হচ্ছিল। মা-বাবা দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। মুগদা হাসপাতালে এখনো চিকিৎসা চলছে তার।

সানির মা আকলিমা আক্তারের তথ্য মতে, শুধু তাঁর ছেলে নয়, এলাকায় ঘরে ঘরে এখন জ্বরের রোগী। শারীরিক অবস্থা জটিল না হলে কেউ হাসপাতালে যেতে চায় না।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত এক মাসে ডেঙ্গু ইউনিটে ভর্তি রোগীদের একটি বড় অংশই গোপীবাগ, কমলাপুর, রেলওয়ে ব্যারাক, শাহজাহানপুর, মানিকনগর, খিলগাঁও এলাকার। বুধবার ওই হাসপাতালে ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ১৫ জন শিশু।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) এক জরিপে উঠে এসেছে, রাজধানীর সবচেয়ে বেশি মশার আবাস্থল এসব এলাকায়।

সিডিসির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে এক হাজার ৮৩০টি বাড়িতে জরিপ চালিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে ১১.৭৫ শতাংশ। এটি সিডিসির ম্যালেরিয়া নির্মূল ও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী রোগ নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার মৌসুমকালীন জরিপ। ১১ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার ঘনত্ব বেশি।

জরিপ অনুযায়ী, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অর্থাৎ আরকে মিশন রোড, গোপীবাগ, কমলাপুর, মতিঝিল এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব সর্বোচ্চ, যা ৫৩.৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৩৮ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘনত্ব ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে ৪৮.১ শতাংশ বাড়ি বহুতল, ২৪.৩ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়ি, ১০.৭ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবন, ১১.৯ শতাংশ বস্তি/সেমিপাকা এবং ৪.৯ শতাংশ খালি ফ্ল্যাট।

ঢাকা দক্ষিণে সর্বোচ্চসংখ্যক লার্ভা পাওয়া গেছে জলমগ্ন মেঝেতে ১৮.১৫ শতাংশ, প্লাস্টিক ড্রামে ১৭.৩৭ শতাংশ, প্লাস্টিকের বালতিতে ১৩.৫১ শতাংশ। ডিএসসিসিতে এডিস মশার সবচেয়ে বেশি আবাসস্থল পাওয়া গেছে বহুতল ভবনে ৩৩ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ২২.৮ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ২৭ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ১২.১ শতাংশ এবং ফাঁকা প্লটে ৫.১ শতাংশ।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সবার খবর আমরা পাই না। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে, তাদের খবরই কেবল পাই। তাই কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো। হাসপাতালে থাকলে সেবার মধ্যে থাকে এবং তার মৃত্যুঝুঁকিটা কমে যায়। ডেঙ্গু সন্দেহে রক্ত পরীক্ষা করার দুই ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এ জন্য জ্বর নিয়ে অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো। ’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম নয়। এতে এটা স্পষ্ট যে সেখানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার দৌরাত্ম্য চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সিডিসির জরিপে দেখা গেছে, ৪০টি ওয়ার্ডে এক হাজার ৩১৯টি বাড়িতে ১৩.৪ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। লার্ভার ঘনত্ব ১৬.৩৮ শতাংশ। সর্বোচ্চ ঘনত্ব ৩৬.৬ শতাংশ পাওয়া গেছে ১১, ১৪ ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এলাকাগুলো হলো মিরপুর, কাফরুল ও গুলশান। এর মধ্যে ৫১.৪ শতাংশ বাড়ি বহুতল, ১৮.২ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়ি, ১৩.১ শতাংশ বাড়ি নির্মাণাধীন, ১২.৬ শতাংশ বাড়ি বস্তি/সেমিপাকা এবং ৪.৬ শতাংশ খালি ফ্ল্যাট। সর্বোচ্চসংখ্যক লার্ভা পাওয়া গেছে জলমগ্ন মেঝেতে ১৮.৬ শতাংশ, প্লাস্টিক বালতিতে ১৫.২৮ শতাংশ ও প্লাস্টিক ড্রামে ১০.১৯ শতাংশ।

২৪.৮ শতাংশ এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে নির্মাণাধীন বাড়িতে, ৪৫.২ শতাংশ বহুতল ভবনে, ২০.৩ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়িতে, ৬.৮ শতাংশ বস্তি/ সেমিপাকা বাড়িতে এবং ২.৮ শতাংশ খালি স্থানে।

ঢাকা উত্তর সিটির কল্যাণপুরের বাসিন্দা সুজিৎ নন্দী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিত ওষুধ দেয়। কিন্তু মশা কমে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাচ্চারা যখন পড়াশোনা করে, মশার উৎপাত বেড়ে যায়। এখন এমন হয়েছে যে সারাক্ষণ একটা আতঙ্ক কাজ করে। চারদিকে মানুষের জ্বর। অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। দোকান থেকে বিভিন্ন ধরনের মশা মারার ওষুধ দিয়েও খুব একটা কাজ হয় না। দেখা যায়, ওষুধ দিলে কিছুক্ষণ মশা কম থাকে। এরপর আগের অবস্থা। ’

ঢাকা উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এর আগেও অভিযোগ এসেছে আমার ওয়ার্ডে মশা বেশি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম দারুসসালাম, রেডিও বাংলাদেশসহ ১০ নম্বরের অনেক এলাকা আমার ওয়ার্ডে দেখানো হয়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে বেশ কিছু পুকুর-ডোবা ছাড়াও সরকারি বিশাল জায়গাজুড়ে বস্তি রয়েছে। এসব জায়গায় মূলত মশা জন্মে। তবে আমরা মশা মারার সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ’

আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগ (পিডাব্লিউডি) বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ করছে, সড়ক গবেষণাগার এরা টিনের বেড়া দিয়ে আটকে রাখেছে। অনেক বলার পরও তারা কথা শুনতে চায় না। তবু আমরা থেমে নেই। আমাদের কর্মীরা প্রতিদিন এলাকা ধরে ধরে মশার ওষুধ দিচ্ছে। ’

মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ নামে পরিচিত। জরিপে দেখা গেছে, উত্তরের ১৩টি ওয়ার্ড ও দক্ষিণের ১৪টি ওয়ার্ড ‘ব্রুটো ইনডেক্সে’ ২০-এর বেশি। অর্থাৎ এসব ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

উত্তরে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলোÍ১, ১১, ১৪, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২৪, ২৮, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৯। দক্ষিণের ৭, ৮, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ২৪, ৩৪, ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪২, ৪৮ ও ৫১। এসব ওয়ার্ডের মধ্যে ১০০টি পানিভরা পাত্রে গড়ে ২০টিতে মশা বা লার্ভা পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। প্রচণ্ড রকম গরমের মধ্যে হালকা বৃষ্টি। এটি ডেঙ্গুর জন্য সহায়ক পরিবেশ। গত ১১ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে ৯৮টি ওয়ার্ডে জরিপে উঠে এসেছে। বহুতল ভবন ও নির্মাণাধীন ভবনের জলমগ্ন মেঝেতে এডিস মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে। বাসাবাড়িতে প্লাস্টিকের বালতি, ড্রাম, ফুলের টবে বেশ কিছুদিন পানি জমে থাকায় এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নির্মাণাধীন স্থানে দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় এবং ড্রামে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা হয়।

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রাইমারি ডেঙ্গুর সংখ্যা খুব কম। বেশির ভাগ মানুষের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো ডেঙ্গু হচ্ছে। এটি সবচেয়ে ভয়ানক। ফলে মর্টালিটিও বেড়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগ শিশু ও বৃদ্ধ। দেখা যায়, তাদের শরীরের যেসব জায়গা অনাবৃত থাকে, সেখানে মশা বেশি কামড়াচ্ছে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর এক দিনের বেশি হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।

Tag :
জনপ্রিয়

পুকুরে ধরা পড়ল রুপালী ইলিশ

ঢাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি দক্ষিণে মশা বেশি

প্রকাশের সময় : ০৯:০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

টানা তিন দিন থেমে থেমে জ্বর। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। এমবিএর শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন খান ভাবলেন সাধারণ জ্বর। ওষুধের দোকান থেকে জ্বরের ওষুধ কিনে খেলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন গোপীবাগের এই বাসিন্দা।

কিন্তু জ্বর আর সারে না। অথচ সামনে পরীক্ষা। এরপর চিকিৎসক দেখিয়ে তাঁর পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করালেন। শনাক্ত হলো ডেঙ্গু।

এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রাকিব বলেন, চার দিন রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর এখন অনেকটা সুস্থ। এর মধ্যে এলাকার পরিচিত বেশ কয়েকজনকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে দেখেছেন। তাঁর পরিচিত দুজন এখনো ভর্তি একই হাসপাতালে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আরেকটি এলাকা রেলওয়ে ব্যারাক। সেখানকার শিশু রবিউল সানির (১০) জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া ও বমি হচ্ছিল। মা-বাবা দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। মুগদা হাসপাতালে এখনো চিকিৎসা চলছে তার।

সানির মা আকলিমা আক্তারের তথ্য মতে, শুধু তাঁর ছেলে নয়, এলাকায় ঘরে ঘরে এখন জ্বরের রোগী। শারীরিক অবস্থা জটিল না হলে কেউ হাসপাতালে যেতে চায় না।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত এক মাসে ডেঙ্গু ইউনিটে ভর্তি রোগীদের একটি বড় অংশই গোপীবাগ, কমলাপুর, রেলওয়ে ব্যারাক, শাহজাহানপুর, মানিকনগর, খিলগাঁও এলাকার। বুধবার ওই হাসপাতালে ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ১৫ জন শিশু।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) এক জরিপে উঠে এসেছে, রাজধানীর সবচেয়ে বেশি মশার আবাস্থল এসব এলাকায়।

সিডিসির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে এক হাজার ৮৩০টি বাড়িতে জরিপ চালিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে ১১.৭৫ শতাংশ। এটি সিডিসির ম্যালেরিয়া নির্মূল ও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী রোগ নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার মৌসুমকালীন জরিপ। ১১ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার ঘনত্ব বেশি।

জরিপ অনুযায়ী, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অর্থাৎ আরকে মিশন রোড, গোপীবাগ, কমলাপুর, মতিঝিল এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব সর্বোচ্চ, যা ৫৩.৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৩৮ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘনত্ব ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে ৪৮.১ শতাংশ বাড়ি বহুতল, ২৪.৩ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়ি, ১০.৭ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবন, ১১.৯ শতাংশ বস্তি/সেমিপাকা এবং ৪.৯ শতাংশ খালি ফ্ল্যাট।

ঢাকা দক্ষিণে সর্বোচ্চসংখ্যক লার্ভা পাওয়া গেছে জলমগ্ন মেঝেতে ১৮.১৫ শতাংশ, প্লাস্টিক ড্রামে ১৭.৩৭ শতাংশ, প্লাস্টিকের বালতিতে ১৩.৫১ শতাংশ। ডিএসসিসিতে এডিস মশার সবচেয়ে বেশি আবাসস্থল পাওয়া গেছে বহুতল ভবনে ৩৩ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ২২.৮ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ২৭ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ১২.১ শতাংশ এবং ফাঁকা প্লটে ৫.১ শতাংশ।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সবার খবর আমরা পাই না। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে, তাদের খবরই কেবল পাই। তাই কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো। হাসপাতালে থাকলে সেবার মধ্যে থাকে এবং তার মৃত্যুঝুঁকিটা কমে যায়। ডেঙ্গু সন্দেহে রক্ত পরীক্ষা করার দুই ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এ জন্য জ্বর নিয়ে অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো। ’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম নয়। এতে এটা স্পষ্ট যে সেখানে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার দৌরাত্ম্য চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সিডিসির জরিপে দেখা গেছে, ৪০টি ওয়ার্ডে এক হাজার ৩১৯টি বাড়িতে ১৩.৪ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। লার্ভার ঘনত্ব ১৬.৩৮ শতাংশ। সর্বোচ্চ ঘনত্ব ৩৬.৬ শতাংশ পাওয়া গেছে ১১, ১৪ ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এলাকাগুলো হলো মিরপুর, কাফরুল ও গুলশান। এর মধ্যে ৫১.৪ শতাংশ বাড়ি বহুতল, ১৮.২ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়ি, ১৩.১ শতাংশ বাড়ি নির্মাণাধীন, ১২.৬ শতাংশ বাড়ি বস্তি/সেমিপাকা এবং ৪.৬ শতাংশ খালি ফ্ল্যাট। সর্বোচ্চসংখ্যক লার্ভা পাওয়া গেছে জলমগ্ন মেঝেতে ১৮.৬ শতাংশ, প্লাস্টিক বালতিতে ১৫.২৮ শতাংশ ও প্লাস্টিক ড্রামে ১০.১৯ শতাংশ।

২৪.৮ শতাংশ এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে নির্মাণাধীন বাড়িতে, ৪৫.২ শতাংশ বহুতল ভবনে, ২০.৩ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়িতে, ৬.৮ শতাংশ বস্তি/ সেমিপাকা বাড়িতে এবং ২.৮ শতাংশ খালি স্থানে।

ঢাকা উত্তর সিটির কল্যাণপুরের বাসিন্দা সুজিৎ নন্দী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিত ওষুধ দেয়। কিন্তু মশা কমে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাচ্চারা যখন পড়াশোনা করে, মশার উৎপাত বেড়ে যায়। এখন এমন হয়েছে যে সারাক্ষণ একটা আতঙ্ক কাজ করে। চারদিকে মানুষের জ্বর। অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। দোকান থেকে বিভিন্ন ধরনের মশা মারার ওষুধ দিয়েও খুব একটা কাজ হয় না। দেখা যায়, ওষুধ দিলে কিছুক্ষণ মশা কম থাকে। এরপর আগের অবস্থা। ’

ঢাকা উত্তরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এর আগেও অভিযোগ এসেছে আমার ওয়ার্ডে মশা বেশি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম দারুসসালাম, রেডিও বাংলাদেশসহ ১০ নম্বরের অনেক এলাকা আমার ওয়ার্ডে দেখানো হয়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে বেশ কিছু পুকুর-ডোবা ছাড়াও সরকারি বিশাল জায়গাজুড়ে বস্তি রয়েছে। এসব জায়গায় মূলত মশা জন্মে। তবে আমরা মশা মারার সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ’

আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগ (পিডাব্লিউডি) বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ করছে, সড়ক গবেষণাগার এরা টিনের বেড়া দিয়ে আটকে রাখেছে। অনেক বলার পরও তারা কথা শুনতে চায় না। তবু আমরা থেমে নেই। আমাদের কর্মীরা প্রতিদিন এলাকা ধরে ধরে মশার ওষুধ দিচ্ছে। ’

মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ নামে পরিচিত। জরিপে দেখা গেছে, উত্তরের ১৩টি ওয়ার্ড ও দক্ষিণের ১৪টি ওয়ার্ড ‘ব্রুটো ইনডেক্সে’ ২০-এর বেশি। অর্থাৎ এসব ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

উত্তরে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলোÍ১, ১১, ১৪, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২৪, ২৮, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৯। দক্ষিণের ৭, ৮, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ২৪, ৩৪, ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪২, ৪৮ ও ৫১। এসব ওয়ার্ডের মধ্যে ১০০টি পানিভরা পাত্রে গড়ে ২০টিতে মশা বা লার্ভা পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। প্রচণ্ড রকম গরমের মধ্যে হালকা বৃষ্টি। এটি ডেঙ্গুর জন্য সহায়ক পরিবেশ। গত ১১ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে ৯৮টি ওয়ার্ডে জরিপে উঠে এসেছে। বহুতল ভবন ও নির্মাণাধীন ভবনের জলমগ্ন মেঝেতে এডিস মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে। বাসাবাড়িতে প্লাস্টিকের বালতি, ড্রাম, ফুলের টবে বেশ কিছুদিন পানি জমে থাকায় এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নির্মাণাধীন স্থানে দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় এবং ড্রামে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা হয়।

ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রাইমারি ডেঙ্গুর সংখ্যা খুব কম। বেশির ভাগ মানুষের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো ডেঙ্গু হচ্ছে। এটি সবচেয়ে ভয়ানক। ফলে মর্টালিটিও বেড়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগ শিশু ও বৃদ্ধ। দেখা যায়, তাদের শরীরের যেসব জায়গা অনাবৃত থাকে, সেখানে মশা বেশি কামড়াচ্ছে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর এক দিনের বেশি হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।