ঢাকা ০৩:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করাই ওদের পেশা

সুন্দরবনের বনজীবিদের কষ্টের শেষ হয়না

পুরুষেরা মাছ ধরে, গোলপাতা কাটে, কাঁকড়া ধরে আর মধু আহরণ করে থাকে আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। আবার নারীরা কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে। শিশুরা হাঁটাচলা শিখে বাইরে বের হওয়ার পর থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে। কয়রা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পাথরখালী গ্রাম। কাঁচা পাকা রাস্তা দিয়ে এই গ্রামে ঢুকতেই নারী-পুরুষের ভিড় জমে যায়। সবার মুখেই বনজীবীদের বেঁচে থাকার কষ্টের কথা। সরকারি নানামুখী নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বন এখন আর তাদের জীবিকার পথ দেখাতে পারছে না। এসব গ্রামের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বাপ-দাদার আমল থেকে থেকে বনের কাজে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে, তাদের অধিকাংশই বছরের বেশির ভাগ সময় কর্মহীন থাকে।

খুলনা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা কয়রা। ওপারে সুন্দরবন, এপারে লোকালয়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কম প্রশাস্তের ছোট্ট নদী শাকবাড়িয়া। এ নদীর পারে সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪নং কয়রা, ৫নং কয়রা, ৬নং কয়রা, পাথরখালী, কাটকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরপুর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা, গোলখালী, পাথরখালী, তেতুলতলার চর,বানিয়াখালী। এ সকল গ্রামগুলো ঘুরে বনজীবীদের জীবন সংগ্রাামের নানা তথ্য মেলে। গ্রামগুলোতে দেখা গেছে বহু কর্মহীন মানুষকে গাছের ছায়ায়, দোকানে, রাস্তার ধারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে। বনের কাজ ছেড়ে এখন অনেকে মাটিকাটা, কৃষি কাজ, ইটের ভাটায় শ্রম দেওয়া, নদীভাঙন রোধে বলাক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে এতে মজুরি একেবারেই কম। গত বুধবার ভরদুপুরে পাথরখালী থেকে জোড়শিং দিকে যাওয়ার সময় পথে দেখা মিজানুর গাজীর সঙ্গে। পাশের কোনো এক কৃষকের বাড়িতে চুক্তিভিত্তিক একবেলা কাজ শেষে কাঁধে কোদাল নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। মিজানুর আর আমিরুল জানালেন, কখনো কারো বাড়িতে, কখনো চিংড়িঘেরে আবার কখনো বনের কাজে যান। কিন্তু এ দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল। আবার কাজেও নেই কোনো নিশ্চয়তা। অতিকষ্টে কাজ জোগাড় করতে পারলেও মজুরি খুবই সামান্য। সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করেও দেড়-দুই শ টাকার বেশি পায় না তারা। এলাকার অধিকাংশ মানুষ জানালেন, বনের ওপর নির্ভরশীল নিরীহ মানুষদের সেখানে যেতে নানা সমস্যা। বনে অনেক আতঙ্ক, বাঘের ভয়। রয়েছে কুমির কামট আর দেও দোত্তের ভয়। কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ আক্তারুজ্জামান বলেন, পারমিটধারী বনজীবীরা কোনো বাধা ছাড়াই বনে কাজ করতে পারে। জেলে বাওয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে সুন্দরবনের গা ঘেঁষে জেগে থাকা এই গ্রামগুলোর মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করে বনের ওপর। বনে প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মাছধরা, কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণ। এ ছাড়া বনের ভেতরে ও আশপাশের নদীতে স্থানীয়রা চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে আবার মৌসুম ভিত্তিতে এসব কাজ করে।

হয়তো বছরের তিন মাস বনে কাজ করে, বাকি সময় অন্য কাজে যায়। তা ছাড়া রয়েছে আর বিড়ম্বনা মাসে ১৫ সুন্দরবনে যেতে পারে আর ১৫ দিন ভাটিগার গোন থাকায় কোন মাছের দেখা না মেলায় তারা সুন্দর বনে যায়না। তাই সুন্দরবনের জেলেদের ১৫ দিনের আয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালাতে হয়। ৪নং কয়রা এলাকার বাসিন্দা মোঃ নুরুল হুদা প্রায় ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু আহরণ করেন। তিনি জানান, বাংলা সনের চৈত্র মাসের ১৮ তারিখে মধু আহরণকারীদের পারমিট দেওয়া হয়। আটজনের একটি দল এক মাসের জন্য মধু আহরণে যায়। এ বছর অধিক মধুর পাশ হওয়ায় তেমন আয় করতে পারেনী। বর্তমানে কাঁকড়া ও মাছের ছাড়া কোন পরমিট নেই। এর উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ জনপদের জেলে পরিবার। কয়রার জোড়শিং ও আংটিহারা এলাকায় চোখে পড়ে বনজীবীদের বিপন্ন বসতি। শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙন এখানকার মানুষদের তাড়িয়ে ফেরে। বহু মানুষ জলোচ্ছাস আইলার পর নির্মিত নতুন বাঁধের ভেতরে ও বাইরে আশ্রয় নিয়েছে। বাঁধের দুধারে সারি সারি ছোট ঘর। কোনোমতে জীবন ধারণ সেখানে। নানা প্রতকুলতা, খাবারের কষ্ট, চিকিৎসার কষ্ট এই মানুষগুলোর নিত্যসাথী। বনজীবীদের এইসব গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় না। যে বয়সে ওদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই শিশুকাল থেকেই ওরা শুরু করে বনে যাওয়ার প্রশিক্ষন। কারণ, ওদের বাবা-মা, দাদা সবাই যে বনজীবী। এই পেশাই হয়তো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের আগামী দিনগুলো। তাই আধুনিক যুগে এ জনপদের সাধারন মানুষ একটু বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা পেলে তাতে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকত পারতো এমন প্রত্যাশা সকলের।

Tag :
জনপ্রিয়

গাজীপুর ঐতিহাসিক রাজবাড়ী মাঠের অমর একুশে বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান

প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করাই ওদের পেশা

সুন্দরবনের বনজীবিদের কষ্টের শেষ হয়না

প্রকাশের সময় : ১০:৫২:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

পুরুষেরা মাছ ধরে, গোলপাতা কাটে, কাঁকড়া ধরে আর মধু আহরণ করে থাকে আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। আবার নারীরা কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে। শিশুরা হাঁটাচলা শিখে বাইরে বের হওয়ার পর থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে। কয়রা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পাথরখালী গ্রাম। কাঁচা পাকা রাস্তা দিয়ে এই গ্রামে ঢুকতেই নারী-পুরুষের ভিড় জমে যায়। সবার মুখেই বনজীবীদের বেঁচে থাকার কষ্টের কথা। সরকারি নানামুখী নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বন এখন আর তাদের জীবিকার পথ দেখাতে পারছে না। এসব গ্রামের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বাপ-দাদার আমল থেকে থেকে বনের কাজে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে, তাদের অধিকাংশই বছরের বেশির ভাগ সময় কর্মহীন থাকে।

খুলনা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা কয়রা। ওপারে সুন্দরবন, এপারে লোকালয়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কম প্রশাস্তের ছোট্ট নদী শাকবাড়িয়া। এ নদীর পারে সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪নং কয়রা, ৫নং কয়রা, ৬নং কয়রা, পাথরখালী, কাটকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরপুর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা, গোলখালী, পাথরখালী, তেতুলতলার চর,বানিয়াখালী। এ সকল গ্রামগুলো ঘুরে বনজীবীদের জীবন সংগ্রাামের নানা তথ্য মেলে। গ্রামগুলোতে দেখা গেছে বহু কর্মহীন মানুষকে গাছের ছায়ায়, দোকানে, রাস্তার ধারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে। বনের কাজ ছেড়ে এখন অনেকে মাটিকাটা, কৃষি কাজ, ইটের ভাটায় শ্রম দেওয়া, নদীভাঙন রোধে বলাক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে এতে মজুরি একেবারেই কম। গত বুধবার ভরদুপুরে পাথরখালী থেকে জোড়শিং দিকে যাওয়ার সময় পথে দেখা মিজানুর গাজীর সঙ্গে। পাশের কোনো এক কৃষকের বাড়িতে চুক্তিভিত্তিক একবেলা কাজ শেষে কাঁধে কোদাল নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। মিজানুর আর আমিরুল জানালেন, কখনো কারো বাড়িতে, কখনো চিংড়িঘেরে আবার কখনো বনের কাজে যান। কিন্তু এ দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল। আবার কাজেও নেই কোনো নিশ্চয়তা। অতিকষ্টে কাজ জোগাড় করতে পারলেও মজুরি খুবই সামান্য। সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করেও দেড়-দুই শ টাকার বেশি পায় না তারা। এলাকার অধিকাংশ মানুষ জানালেন, বনের ওপর নির্ভরশীল নিরীহ মানুষদের সেখানে যেতে নানা সমস্যা। বনে অনেক আতঙ্ক, বাঘের ভয়। রয়েছে কুমির কামট আর দেও দোত্তের ভয়। কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ আক্তারুজ্জামান বলেন, পারমিটধারী বনজীবীরা কোনো বাধা ছাড়াই বনে কাজ করতে পারে। জেলে বাওয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে সুন্দরবনের গা ঘেঁষে জেগে থাকা এই গ্রামগুলোর মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করে বনের ওপর। বনে প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মাছধরা, কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণ। এ ছাড়া বনের ভেতরে ও আশপাশের নদীতে স্থানীয়রা চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে আবার মৌসুম ভিত্তিতে এসব কাজ করে।

হয়তো বছরের তিন মাস বনে কাজ করে, বাকি সময় অন্য কাজে যায়। তা ছাড়া রয়েছে আর বিড়ম্বনা মাসে ১৫ সুন্দরবনে যেতে পারে আর ১৫ দিন ভাটিগার গোন থাকায় কোন মাছের দেখা না মেলায় তারা সুন্দর বনে যায়না। তাই সুন্দরবনের জেলেদের ১৫ দিনের আয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালাতে হয়। ৪নং কয়রা এলাকার বাসিন্দা মোঃ নুরুল হুদা প্রায় ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু আহরণ করেন। তিনি জানান, বাংলা সনের চৈত্র মাসের ১৮ তারিখে মধু আহরণকারীদের পারমিট দেওয়া হয়। আটজনের একটি দল এক মাসের জন্য মধু আহরণে যায়। এ বছর অধিক মধুর পাশ হওয়ায় তেমন আয় করতে পারেনী। বর্তমানে কাঁকড়া ও মাছের ছাড়া কোন পরমিট নেই। এর উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ জনপদের জেলে পরিবার। কয়রার জোড়শিং ও আংটিহারা এলাকায় চোখে পড়ে বনজীবীদের বিপন্ন বসতি। শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙন এখানকার মানুষদের তাড়িয়ে ফেরে। বহু মানুষ জলোচ্ছাস আইলার পর নির্মিত নতুন বাঁধের ভেতরে ও বাইরে আশ্রয় নিয়েছে। বাঁধের দুধারে সারি সারি ছোট ঘর। কোনোমতে জীবন ধারণ সেখানে। নানা প্রতকুলতা, খাবারের কষ্ট, চিকিৎসার কষ্ট এই মানুষগুলোর নিত্যসাথী। বনজীবীদের এইসব গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় না। যে বয়সে ওদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই শিশুকাল থেকেই ওরা শুরু করে বনে যাওয়ার প্রশিক্ষন। কারণ, ওদের বাবা-মা, দাদা সবাই যে বনজীবী। এই পেশাই হয়তো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের আগামী দিনগুলো। তাই আধুনিক যুগে এ জনপদের সাধারন মানুষ একটু বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা পেলে তাতে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকত পারতো এমন প্রত্যাশা সকলের।